Thursday, 14 December 2023

একাত্তরের চিঠি



 সবিনয় নিবেদন



এত গৌরবময়, এত বেদনাময় বছর বাঙালির জীবনে আগে কখনো আসেনি। বছরটি ১৯৭১। এই একটি বছরের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্ব বাংলাদেশকে জানল, চিনল এবং বুঝতে পারল সবুজ শ্যামল প্রকৃতির কাদামাটির মতো নরম বাঙালি প্রয়োজনে কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। কোনো সন্দেহ নেই বাঙালি বর্ষাকালে যেমন কোমল, গ্রীষ্মে তেমনই রুক্ষ ও কঠিন।


কে ভাবতে পেরেছিল 'ভেতো বাঙালি' নামে অভিহিত, 'কাপুরুষ' পরিচয়ে পরিচিত বাঙালি জাতি পাকিস্তান নামের অবাস্তব একটি রাষ্ট্রের জন্মের ছয় মাস যেতে না যেতেই আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠায়, মাতৃভাষার অধিকার অর্জনে সোচ্চার হয়ে উঠবে? পৃথিবীতে এমন দৃষ্টান্ত বিরল যে শুধু ভাষার জন্য সংগ্রাম করে, স্বাধীনতা অর্জনের বীজটি বপন করে, ২৩ বছর অতিক্রান্ত হতে না হতেই একটি প্রদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। এর জন্য সেই প্রদেশের অধিবাসীদের সশস্ত্র যুদ্ধ করতে হয়েছে যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে; এবং অবিশ্বাস্য সত্য হচ্ছে 'ভীরু, অলস, কর্মবিমুখ, কাপুরুষ, ভেতো, যুদ্ধবিদ্যায় অনভিজ্ঞ' এই বাঙালিই মাত্র নয় মাসে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে।


এই অসম্ভব কাজটি করা সম্ভব হয়েছে, কারণ এটি ছিল জনযুদ্ধ। সাধারণ, অতিসাধারণ কৃষক, মজুর, জেলে, কামার, কুমার, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, শিল্পী, ছাত্রছাত্রী, কন্যা, স্ত্রী এমনকি বয়স্ক নারী-পুরুষও সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন: যুদ্ধে অনেক প্রবীণ-প্রবীণা মুক্তিবাহিনীর অকুতোভয় সৈনিকদের প্রতি সর্বতোভাবে সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন।


স্বাধীনতার জন্য প্রাণের আবেগ যখন দুর্দমনীয় হয়ে ওঠে, তখন পৃথিবীর যত ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্রই ব্যবহার করা হোক না কেন, সেই আবেগের কাছে তা তুচ্ছ হয়ে যায়। তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি আমেরিকা-ভিয়েতনামের যুদ্ধে। বিশ্ববাসী সেই প্রমাণ প্রত্যক্ষ করেছে ১৯৭১ সালে, বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে।


'জনযুদ্ধ' কথাটির সূত্রেই আমরা একাত্তরের চিঠির চিঠিগুলো পর্যালোচনা করলে দেখতে পাব বেশির ভাগ চিঠিই লিখেছেন তরুণ যোদ্ধারা; অল্পশিক্ষিত যুবক, স্কুল-কলেজের ছাত্র। লক্ষ করেছি, প্রায় সব চিঠি-লেখক যোদ্ধা যুদ্ধে গেছেন দেশমাতৃকার লাঞ্ছনা ও গ্লানি মোচনের লক্ষ্যে, পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে। তাঁদের আগে থেকে কোনো যুদ্ধপ্রস্তুতি নেই, প্রশিক্ষণ নেই, এমনকি অনেকে সামান্য গাদাবন্দুক কী, তাও জানেন না। আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র কতটা মারাত্মক, তা না জেনে যুদ্ধে অংশ নিয়ে যখন বুঝতে পারেন এ এক অসম যুদ্ধ; তখন, কী বিস্ময়, রণে ভঙ্গ না দিয়ে তাঁরা আরও বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন। আমাদের নিয়মিত সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাঙালি

যোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন প্রথামাফিক; অনিয়মিত যোদ্ধারা লড়াই করেছেন প্রাণের আবেগকে শ্রেষ্ঠ অস্ত্র বানিয়ে।


এবং এই আবেগের স্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে প্রকাশিত বেশির ভাগ চিঠিতে। উদাহরণ দেওয়া যাক: ৫ এপ্রিল, ১৯৭১ তারিখে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র ১০ দিন পর 'তোমারই হতভাগা ছেলে' এ বি এম মাহবুবুর রহমান (সুফী) যখন লেখেন, 'মাগো, তুমি যখন এ পত্র পাবে, আমি তখন তোমার থেকে অনেক অনেক দূরে থাকব। মা, জানি তুমি আমাকে যেতে দিবে না, তাই তোমাকে না বলে চলে যাচ্ছি। তবে যেদিন মা-বোনের ইজ্জতের প্রতিশোধ এবং এই মাতৃভূমি সোনার বাংলাকে শত্রুমুক্ত করতে পারব, সেদিন তোমার ছেলে তোমার কোলে ফিরে আসবে। দোয়া করবে মা, আমার আশা যেন পূর্ণ হয়', তখন কে রোধে সেই অপ্রতিরোধ্য দেশপ্রেমিককে?


ওই সালের এপ্রিলেরই ৪ তারিখে শহীদ জিন্নাত আলী খান 'মা'কেই লিখছেন:


'মা, আমার সালাম গ্রহণ করবেন। পর সংবাদ, আমি আপনাদের দোয়ায় এখনো পর্যন্ত ভালো


আছি। কিন্তু কত দিন থাকতে পারব বলা যায় না। বাংলা মাকে বাঁচাতে যে ভূমিতে আপনি


আমাকে জন্ম দিয়েছেন, যে ভাষায় কথা শিখিয়েছেন, সেই ভাষাকে, সেই জন্মভূমিকে রক্ষা


করতে হলে আমার মতো অনেক জিন্নার প্রাণ দিতে হবে। দুঃখ করবেন না, মা। আপনার সম্মান


রক্ষা করতে গিয়ে যদি আপনার এই নগণ্য ছেলের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়, সে রক্ত


ইতিহাসের পাতায় সাক্ষ্য দেবে যে বাঙালি এখনো মাতৃভূমি রক্ষা করতে নিজের জীবন পর্যন্ত


বুলেটের সামনে পেতে দিতে দ্বিধা বোধ করে না।'


উদ্ধৃতি দেওয়া প্রয়োজন 'মা রাহেলা খাতুন'-এর 'হতভাগ্য ছেলে খোরশেদ'-এর ২৩ এপ্রিল, ১৯৭১ তারিখে লিখিত চিঠিটির:


'মা


দোয়া করো। তোমার ছেলে আজ তোমার সন্তানদের রক্তের প্রতিশোধ নিতে চলেছে। বর্বর পাকিস্তানি জঙ্গিগোষ্ঠী আজ তোমার সন্তানদের ওপর নির্বিচারে অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। যেখানে তোমার সন্তানদের ইজ্জতের ওপর আঘাত করেছে, সেখানে তো আর তোমার সন্তানেরা চুপ করে বসে থাকতে পারে না। তাই আজ তোমার হাজার হাজার বীর সন্তানেরা বাঁচার দাবি নিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করবার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তোমার নগণ্য ছেলে তাদের মধ্যে একজন।'


গর্বে বুক ভরে যায় বাবার কাছে লেখা 'স্নেহের টুকরো' ছেলের চিঠি পড়ে। ১৩৭৮ সনের ২৭ আষাঢ় তারিখে মুক্তিযোদ্ধা 'হক' লিখছেন:


'আব্বা


আমার সালাম ও কদমবুচি গ্রহণ করুন। জীবনের যত অপরাধ, ক্ষমা করে দেবেন। আমি আজ চলে যাচ্ছি, জানি না আর ফিরে আসব কি না। যদি ফিরে আসতে পারি, তাহলে দেখা হবে। আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, যেন আপনার ছেলে এ দেশের মুক্তিসংগ্রামে গাজি হতে পারে।' লক্ষণীয়, একাত্তরের চিঠির বেশির ভাগ চিঠিই মাকে লেখা। চিঠিগুলো পড়ে মনে হয়, 'মা' ও 'স্বদেশ' যেন একই শব্দ, সমার্থক। ১ আগস্ট, ১৯৭১ তারিখের চিঠিতে ইসহাক খান মাকে 'ডেকে ডেকে' বলছেন, 'মাগো, তুমি আমায় ডাকছিলে? আমার মনে হলো তুমি আমার শিয়রে বসে কেবলই আমার নাম ধরে ডাকছ। তোমার অশ্রুজলে আমার বক্ষ ভেসে যাচ্ছে, তুমি এত কাঁদছ? আমি তোমার ডাকে সাড়া দিতে পারলাম না। তাই আমায় ডেকে ডেকে হয়রান হয়ে গেলে।'

সম্পূর্ণ বইটি ডাউনলোড করতে নিচের অপশনে ক্লিক করুন--


আরো বই পেতে  আপনার বন্ধুদের কাছে শেয়ার করে আমাদের সাথে থাকুন। ধন্যবাদ

No comments:

Post a Comment