টান
বাজার হাতে থমকে দাঁড়ালেন সুখময়। তাঁর সযত্নে সাজানো একতলার ড্রয়িংরুমে উদ্দাম লাফালাফি করছে দুই শিশু। জুতো পায়ে দামী সোফায় উঠছে, ঝাঁপ কাটছে নকশাদার গালিচায়। তকতকে মোজাইক মেঝেতে এলোমেলো ছড়ানো গোটা দু-তিন কিটসব্যাগ, প্লাস্টিকের থলি, সস্তাদামের ওয়াটার-বটল।
সুখময়ের ভুরুতে ভাঁজ পড়ল, তুই কোত্থেকে?
-এই এলাম। সুখময়ের প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিল না অমল। দাঁত ছড়িয়ে হাসল,-ধরো তোমাদের দেখতে। বুড়োবুড়ি একলাটি পড়ে আছ!
সুখময় একটুও প্রীত হলেন না। বাইরে থেকেই এখানকার কলরব কানে বাজছিল। কলরব নয়, যাকে বলে তাণ্ডব। তাঁর তপোবনের মতো প্রশান্ত গৃহ আর্তনাদ করছে শিশুদের হুড়ুদ্দুমে। তখনও কি ছাই বুঝেছেন, তাঁর অকালকুষ্মাণ্ড ভাগ্নেটিই এসে হাজিব হয়েছে সাতসকালে। সেই সিউড়ি থেকে-লটবহর সমেত।
হাতের বাজার রান্নাঘরে নামিয়ে এলেন সুখময়। দূরন্ত শিশু দুটি একটু থমকাল। হাঁ করে দেখছে সুখময়কে। বড়টা বছর পাঁচেকের। ছোটটা বড় জোর তিন।
এক ঝলক ছেলে দুটোকে জরিপ করে সুখময় পাখার নীচে বসলেন, খবর কি তোদের? মেজদি কেমন আছে? জামাইবাবু?
-মা-বাবারা এই বয়সে যেমন থাকে, তেমনই আছে। গেঁটে বাত। অর্শ। বুক- ধড়ফড়। প্রেসার। সুগার। অমল বাবু হয়ে সোফায় বসল, মামীও তো দেখলাম বেশ কাত হয়ে পড়েছে!
-হুঁ। সুখময় গম্ভীর,-কদিন ধরে শ্বাসকষ্ট চলছে। কাল একটু বাড়াবাড়ি হয়েছিল। একটু নয়, কাল রাতে বেশ ভালই বাড়াবাড়ি হয়েছিল অনুরূপার। বরাবরই তাঁর সর্দিকাশির ধাত, বছর আষ্টেক হল একটি বিশ্রী টানও উঠছে-হাঁপানির। প্রথম প্রথম টানটা শুধু ঋতু বদলের সময়ে আসত। এখন আর মাস-ঋতু মানে না, গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্ত যখন-তখন হানা দেয়।
কালও কষ্ট দিয়েছিল। সন্ধে থেকে অল্পস্বল্প রুটিনমাফিক চাপ ছিল ফুসফুসে। খাওয়া-দাওয়ার পর দুম করে বেড়ে গেল কষ্টটা। দু-চারটে বাঁধা ওষুধ ঘরেই থাকে, তাতেও কমল না। রাত বারোটায় ফোন করতে হল ডাক্তারকে। চেনা ডাক্তার, প্রায়ই দেখে অনুরূপাকে, তবু অত রাতে আসতে রাজী হল না সে। টেলিফোনে ওষুধের নাম আউড়েই খালাস। কাছেই সিএ মার্কেট, সেখানে শঙ্কব মেডিকেল সারারাত খোলা থাকে, রাতদুপুরে দোকানে ছুটলেন সুখময়। ক্যাপসুলটা খেয়েও রাতভর বিছানায় ঠায় বসে রইল অনুরূপা। বালিশ বুকে চেপে হাপরের মত হাঁপাচ্ছেন। গলা কাঁপিয়ে উৎকট শব্দ ছিটকে আসছে। দম বুঝি বেরিয়ে যায়-যায়।
আর সুখময়? একবার তখন বালিশ দিচ্ছেন স্ত্রীর পিঠে, একবার মুখে ফসফস ওষুধ স্প্রে দিচ্ছেন আর উদ্বিগ্নমুখে তাকিয়ে আছেন। কীভাবে যে কেটেছে রাতটা!
এই মায়া-১
বইটি ডাউনলোড করতে নিচের অপশনে ক্লিক করুন........



No comments:
Post a Comment